রাজনীতি - পরীক্ষামূলক সম্প্রচার

Menu:

৫৭ বছরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়কের পাশে রাজশাহী শহর থেকে ৫ কিলোমিটার দুরে পদ্মার তীর ঘেষে রয়েছে একটি সবুজ ছায়াঘেরা ক্যাম্পাস। এটিই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরু করে ১৯৫৩ সালের ৬ জুলাই। সেদিন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংখ্যা ছিলো মাত্র ১৬১জন। তার পর একে একে পার হয়ে গেছে ৫৬ বছর। এই সময়ের মধ্য অনেক জল গড়িয়েছে পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া পদ্মায়। বেড়েছে শিক্ষার্থী। বেড়েছে শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ। দেখতে দেখতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এখন মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য ছিলেন ইতরাত হোসেন জুবেরী।

এক.
রাজশাহী ছিলো প্রাচীন বরেন্দ্রভূমির প্রাণকেন্দ্র। ইতিহাসের অনেক রাজশক্তির উত্থান পতনের স্বাক্ষী এই বরেন্দ্র ভূমি। এখন থেকে কয়েক হাজার বছর আগে পাল আমলে এই বরেন্দ্র অঞ্চলেরই নওগাঁ জেলার পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। জ্ঞান বিজ্ঞান ও ধর্মশাস্ত্র চর্চার প্রসিদ্ধ স্থান হিসেবে স্বীকৃত ছিলো এই বৌদ্ধবিহার। সে সময়ে এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা পেয়েছিলো। বিশ্বের নানা দেশ থেকে জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চার জন্য এখানে আসত শিক্ষার্থীরা। কালের গহ্বরে আস্তে আস্তে নিজের গৌরব হারাতে থাকে বরেন্দ্রভূমি। পিছিয়ে পড়তে থাকে ক্রমশ। এক সময়ের সমৃদ্ধশালী বরেন্দ্র ভূমি পরিনত হয় শিক্ষাদীক্ষা অর্থনীতিসহ নানা ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া অঞ্চল হিসেবে।
ব্রিটিশ যুগে রাজশাহী অঞ্চলের শিক্ষাদীক্ষা উন্নয়নের জন্য ১৮৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয রাজশাহী কলেজ। রাজশাহী কলেজের অবস্থানও ছিলো বেশ ওপরে। কলকাতার প্রেসিডেন্সী কলেজের পরই রাজশাহী কলেজের স্থান ধরা হতো।সে সময়ে রাজশাহী কলেজে আইন বিভাগসহ পোস্ট গ্রাজুয়েট ক্লাশ চালু করা হয়েছিলো। কিন্ত এর কিছুদিন পরেই বন্ধ হয়ে যায় এসব কার্যক্রম। সে সময়েই রাজশাহীতে একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রয়োজন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর পাকিস্তান সরকার দেশের সব কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করে।  রাজশাহীতে এ সময় স্যাডলার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পক্ষে আন্দোলন শুরু হয়।
দুই.
ভাষা আন্দোলনের কিছুদিন আগ থেকেই রাজশাহীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন বেশ জোরে শোরেই শুরু হয়। ১৯৫০ সালের ১৫নভেম্বর রাজশাহীর বিশিষ্ট ব্যাক্তিদের নিয়ে ৬৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়। ১৯৫২ সালের  ১০ ফেব্রুয়ারী রাজশাহী শহরের ভূবন মোহন পার্কে রাজশাহীতে বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ স্থাপনের জন্য সর্বপ্রথম জনসভা অনুষ্ঠিত হয়।  প্রথম দাবি অবশ্য ওঠে রাজশাহী কলেজেই। ১৯৫২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারী  শহরের সব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা রাজশাহী কলেজ প্রাঙ্গনে সমবেত হয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ পাস করার দাবি তোলে। এই দাবি পাঠিয়ে দেয়া হয় সেসময়ের এমএলএ ও মন্ত্রীদের কাছে।
পরবর্তীতে ১৩ ফেব্রুয়ারী ভূবন মোহন পার্কেই অনুষ্ঠিত হয় আরও একটি জনসভা। ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন আলহাজ্ব আব্দুল হামিদ এমএলএ। সভায় বক্তব্য রাখেন ইদ্রিস আহমেদ এমএলএ, প্রভাষ চন্দ্র লাহিড়ী, খোরশেদ আলম, আনসার আলী, আব্দুল জব্বার প্রমূখ। ক্রমেই তীব্র হতে থাকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি। এক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানাতে গিয়ে কারারুদ্ধ হন ১৫ ছাত্রনেতা। পরে ছাত্রজনতার পক্ষ থেকে ঢাকায় একটি ডেলিগেশন পাঠানো হয়। ওই ডেলিগেশনের সদস্যদের মধ্যে মরহুম আবুল কালাম চৌধুরী ও আব্দুর রহমানের নাম উল্লেখযোগ্য। এভাবে একের পর এক আন্দালনের চাপে স্থানীয় আইন পরিষদ রাজশাহীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে গুরুত্ব দেয়। এই আন্দোলনে  একাত্ব হন পূর্ববঙ্গীয় আইনসভার সদস্য প্রখ্যাত আইনজীবী মাদার বখশ।
১৯৫৩ সালের ৬ ফেব্র“য়ারী ভূবন মোহন পার্কে আরও একটি জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে মাদারবখশ সরকারকে হুশিয়ার করে বলেন, যদি রাজশাহীতে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন না হয় তবে  উত্তরবঙ্গকে একটি স্বতন্ত্র প্রদেশ দাবি করতে আমরা বাধ্য হব। মাদার বখশের এই বক্তব্যে সাড়া পড়ে দেশের সুধী মহলে। টনক নড়ে সরকারেরও। অবশেষে ১৯৫৩ সালের  ৩১মার্চ প্রাদেশিক আইনসভায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা আইন পাশ হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামো পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন মাদারবখশ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য প্রফেসর ইতরাত হোসেন জুবেরীকে সঙ্গে নিয়ে। এ দুজনকে যুগ্ম সম্পাদক করে   মোট ৬৪ সদস্য বিশিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হয়। এর পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার এম এ খুরশীদ।
তিন.
আনুষ্ঠানিকভাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৫৪ সাল থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ক্লাম শুরু হয় ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী কলেজে। উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের দফতর প্রতিষ্ঠা করা হয় পদ্মার তীরের বড়কুঠি নামে পরিচিত ঐতিহাসিক রেশম কুঠির ওপর তলায়। বড়কুঠির কাছেই তৎকালীন ভোলানাথ বিশ্বেশ্বর হিন্দু একাডেমিতে চিকিৎসাকেন্দ্র ও পাঠাগার তেরি করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দফতর স্থাপন করা হয় জমিদার কুঞ্জমোহন মৈত্রের বাড়িতে। বড়কুঠিপাড়ার মাতৃধাম এ স্থাপন করা হয় কলেজ পরিদর্শক দফতর। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতম রেজিস্ট্রার নিযুক্ত হন ওসমান গনি ও প্রথম পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক নিযুক্ত হন অধ্যক্ষ আব্দুল করিম। শহরের বিভিন্ন স্থানে ভাড়া করা বাড়িতে গড়ে ওঠে ছাত্রাবাস। রাজশাহী কলেজ সংলগ্ন ফুলার হোস্টেলকে রুপান্তরিত করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবাস হিসেবে। বড়কুঠি এলাকার লালকুঠি ভবন ও আরেকটি ভাড়া করা ভবনে ছাত্রী নিবাস স্থাপন করা হয়।
১৯৬১ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম স্থানান্তর করা হয় মতিহারের নিজস্ব ক্যাম্পাসে। এই ক্যাম্পাসটি গড়ে ওঠে অস্ট্রেলিয়ান স্থপতি ড. সোয়ানি টমাসের স্থাপত্য পরিকল্পনায়। দক্ষিণ দিক দিয়ে ছুটে চলেছে রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়ক, উত্তরের রেললাইনের মাঝে ছায়া ঢাকা সবুজ শ্যামলে ঘেরা এই ক্যাম্পাস।
চার.
এখন প্রায় ৩০৪ হেক্টর জুড়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে ৫টি উচ্চতর গবেষনা ইন্সটিটিউট, ৮টি অনুষদের অধীনে ৪৬টি বিভাগে বতৃমানে পরিচারিত হচ্ছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম। ক্যাম্পাসের উত্তর পুর্ব দিক জুড়ে রয়েছে ১১টি ছাত্রহল। ৫টি ছাত্রীহল ক্যাম্পাসের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। এর পাশেই নির্মিানাধীন রয়েছে আরও একটি ছাত্রী হল। পুর্ব ও পশ্চিম প্রান্ত জুড়ে রয়েছে শিক্ষকদের জন্য আবাসিক এলাকা। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম লাইব্রেরীটি এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। এছাড়া রয়েছে, মেডিকেল সেন্টার, কম্পিউটার সেন্টার, শহীদ মিনার, স্টেডিয়াম। বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা এদেশের সর্বপ্রথম স্থাপিত মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর। রয়েছে সাবাস বাংলাদেশ নামে একটি অপুর্ব শৈলির ভাষ্কর্য। আর  রয়েছে গোল্ডেন যুবিলী টাওয়ার।  প্রতিদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব স্থানে ঘুরতে আসেন সারা দেশ থেকে প্রচুর দর্শনার্থী। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য হিসেবে কর্মরত আছেন প্রফেসর এম এ সোবহান। উপ-উপাচার্য প্রফেসর নুরুল্লাহ।
পাঁচ.
দীর্ঘ ৫৬ বছরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস জড়িত হয়েছে বেশ কয়েকজন প্রতিথযশা ব্যাক্তিত্বের স্মৃতিতে। এখানে শিক্ষকতা করেছেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত ভাষাবিজ্ঞানী ও সাহিত্যক ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. মুহাম্মদ এনামুল হক,তত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি হাবিবুর রহমান, খ্যাতনামা ঐতিহাসিক ডেভিড কফ, নৃবিজ্ঞানী পিটার বাউচি, ক্লারেন্স ম্যালেনি , জোহানা কর্ক প্যাট্রিক, বিশিষ্ট ঐতিহাসিক প্রফেসর আব্দুল করিম, রমিলা থামার, উপমহাদেশের প্রখ্যাত কথা সাহিত্যক হাসান আজিজুল হক প্রমূখ। প্রথম পাতায় যান